সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে যৌতুকলোভী পলাতক আসামী হবিনূরের ভয়ে সন্তানসহ বাড়ীঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন স্ত্রী জোনাকী

আল-হেলাল, সুনামগঞ্জ: স্বামী নামের যৌতুকলোভী পলাতক আসামী হবিনুর বখাটে মাস্তানদের দাপট খাটিয়ে খুন করার হুমকী দিয়ে ভিটেবাড়ী ছাড়া করেছে স্ত্রী সন্তানকে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর থানার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের বালিয়াঘাট গ্রামে সম্প্রতি এ ঘটনাটি ঘটে।

জানা যায়, ২০১২ইং সনের ২৭ মে একই গ্রামের শামছুন নূরের কন্যা জোনাকী বেগমের বিবাহ হয় বালিয়াঘাট গ্রামের মোঃ জিনু মিয়ার পুত্র হবিনুরের সাথে। বিবাহের সময় জোনাকীর মাতা হবিনূরকে উপঢৌকন হিসেবে টেবিল চেয়ার পালং টেলিভিশনসহ ৬০ হাজার টাকার মালামাল প্রদান করেন। কিন্তু হবিনূর এতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। সে আরো যৌতুক বাবত টাকা পয়সা এনে দেয়ার জন্য জোনাকীকে চাপপ্রয়োগ ও মারপিট করতে থাকে। এরপরও জোনাকী দু:খ কষ্টে তার দাম্পত্য জীবন চালাতে থাকে। ইতিমধ্যে জিসান মনি ও মোহনা বেগম নামে ২টি কন্যা সন্তানের জন্ম হয় তাদের সংসারে।

যৌতুকলোভী স্বামী হবিনুর মদ খেয়ে মাতলামীতে আসক্ত থেকে এবং জুয়া খেলায় মত্ত হয়ে তাহার সহায় সম্পত্তি নষ্ট করে ফেলে। বাধ্য হয়ে জোনাকীর মাতা ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে হবিনুরকে একটি টিনশেড ঘর তৈরী করে দেন। কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার যৌতুক বাবদ টাকা এনে দেওয়ার জন্য জোনাকীকে চাপ দেয় হবিনুর। জোনাকী এতে অপারগতা প্রকাশ করলে হবিনূর তার উপর নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়।

২০১৮ইং সনের ২৭ জানুয়ারি শনিবার সকাল ১১টায় এক লক্ষ টাকা যৌতুকের দাবীতে মারপিট করে ছোট সন্তান মোহনা বেগম (১০ মাস) সহ জোনাকীকে এক কাপড়ে বাড়ী হতে বিতাড়িত করে দেয় সে। জোনাকী মায়ের বাড়ীতে এসে আশ্রয় নিয়ে এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে ঘটনার কথা অবগত করে।

সালিশী পঞ্চায়েতগনের নির্দেশে যৌতুকবিহীন অবস্থায় মেয়েকে সংসারে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য হবিনুর ও তার পিতামাতাকে অনুরোধ করেন। কিন্তু হবিনুর যৌতুকের দাবীকৃত এক লক্ষ টাকা ব্যতিত স্ত্রী সন্তানকে বাড়িতে রাখবেনা বলে সালিশীদেরকে প্রত্যাখ্যান করলে অসহায় জোনাকী আমলগ্রহনকারী জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তাহিরপুর কোর্টে যৌতুক নিরোধ আইনের ৪ ধারায় সি আর মামলা নং ১৯/২০১৮ইং দায়ের করেন।

যৌতুকলোভী হবিনুর শুরু থেকে এ মামলায় দীর্ঘ এক বছর যাবৎ পলাতক রয়েছে। অন্যদিকে পলাতক থেকে স্ত্রী জোনাকী ও তার ছোট কন্যা মোহনা বেগম কে মামলা প্রত্যাহারের দাবীতে প্রাণনাশের হুমকী দিচ্ছে। কিছুদিন আগে মায়ের কোল থেকে ছোট কন্যা সুমনা বেগমকে কেড়ে নিয়ে তার হেফাজতে নেয়।

অন্যদিকে মামলা প্রত্যাহার না করলে সুমনার লাশ মাকে ফেরত দেবে বলে হুমকী দেয়। পরে পুলিশের ভয়ে আবার ছোট মেয়েটিকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেয়।

ঘটনার ব্যাপারে জানতে চাইলে জোনাকীর শ্বশুড় মোঃ জিনু মিয়া বলেন, স্ত্রীর দায়ের করা মামলায় আমার ছেলে হবিনূর গত এক বছর ধরে রাঙ্গামাটিতে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আমি বিষয়টি নিস্পত্তির জন্য বহু চেষ্টা করেছি। দুজন মেম্বার ও একজন সাংবাদিককে দেড়লক্ষ টাকা দিয়েছি। তারা বলেছেন এক লক্ষ টাকা ছেলের বউকে দিয়ে তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি করে দিয়ে ঘটনার নিস্পত্তি করে দেবেন। কিন্তু জোনাকী আমার দেয়া এক লক্ষ টাকা না নেওয়ায় আর নিস্পত্তি হয়নি। পরে সালিশী মেম্বাররা আমার টাকা ফেরত দিয়েছেন।

তারা বলেছেন, জোনাকী কর্তৃক আমার বাড়ীর গাছ কাটা ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে জোনাকী, তার ভাই, মা ও বাবা মামাদের বিরুদ্ধে কাউন্টার পিটিশন মামলা করার জন্য। আমি সাংবাদিক ও মেম্বারের কথায় জোনাকীর বিরুদ্ধে কাউন্টার মামলা করেছি। এখন তারা চাইলেও আমি আর আপোস করতে পারবোনা। কারন সালিশ বিচারে আমার দেড় লক্ষ টাকা খরচ হয়ে গেছে।

জোনাকী বলেন, আমার বিয়ের ৮ বছরের মধ্যে ৫ বছরই আমার শ্বশুড় শ্বাশুড়িগন আমার স্বামীকে বাড়িছাড়া করে রাখে। আমি আমার সন্তানদের ভরন পোষনের জন্য পরের বাড়ীতে খেটে খেয়ে দিনাতিপাত করা অবস্থায় তারা আমার বিরুদ্ধে বখাটে মাস্তান লেলিয়ে দেয়। আমি নিরুপায় হয়ে মান ইজ্জত রক্ষার জন্য শহরে রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবী সৈয়দা আলমতাজ বেগমের বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছি।

আপোস সমঝোতার নামে দেড় লাখ টাকা দ্বারা গুন্ডা মাস্তান ভাড়া করে আমার স্বামী শ্বশুড় শ্বাশুড়ি আমি ও আমার ছোট কন্যাকে গত ৫টি বছর অমানবিক নির্যাতন করে যাচ্ছে। পাশাপাশি কাউন্টার মিথ্যা মামলা দ্বারা আমাদেরকে হয়রানী করার চেষ্টা করছে। আমি পলাতক স্বামীকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশ প্রশাসনের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

তাহিরপুর থানার ওসি মোঃ আতিকুর রহমান বলেন, পলাতক আসামী যেই হউক তাকে গ্রেফতারের জন্য আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

ফেসবুক কমেন্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: